আজকাল অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভোগেন না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন। অনিয়মিত খাওয়াদাওয়া, ভাজাপোড়া খাওয়া, তৈলাক্ত খাবার, প্রক্রিয়াজাত খাবারসহ নানা কারণে অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় ভোগেন ছেলে-বুড়ো প্রায় সবাই। এর লক্ষণ হিসেবে বেশির ভাগ সময়ই আমরা দেখি পেট ফাঁপা, বুক ও গলা জ্বালাপোড়া করা এবং বদহজম। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই সমাধান খোঁজেন ওষুধে। কিন্তু প্রথম দিকে ওষুধ কাজ করলেও পরবর্তী সময়ে ওষুধ কিন্তু আর তেমন কোন কাজে আসে না। অ্যাসিডিটি বা গ্যাস্ট্রিকের সমস্যার সবচেয়ে বড় দাওয়াই হলো এর প্রতিরোধ। কিছু নির্দিষ্ট জিনিস আছে, যা আমাদের অ্যাসিডিটির সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়। যেমন, টানা অনেক্ষন না খেয়ে থাকলে, ভাজাপোড়া খেলে, অনেকক্ষণ ধরে রোদে থাকলে অ্যাসিডিটির সমস্যা দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে বিশেষ কোনো খাবারও অ্যাসিডিটির কারন হতে পারে। কোন ধরনের খাওয়ার খেলে আপনার অ্যাসিডিটি দেখা দেয়, সেটা এড়িয়ে চলাই উত্তম। তবে যদি অ্যাসিডিটির সমস্যায় পড়েই যান, তাহলে কিন্তু হাতের নাগালে থাকা অতি সাধারণ কিছু উপাদান এই অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে। আদা আদা অ্যান্টি-ইনফ্লেমেটরি উপাদান যা অ্যাসিডিটির সমস্যা দূর করতে দারুণ কার্যকরী। আদা কুচি করে সামান্য লবণসহযোগে চিবিয়ে খেলে অ্যাসিডিটির অনেকটাই উপশম হয়ে যায়। আবার চাইলে আদাকুচি জলে সেদ্ধ করে সেই জলও খাওয়া যেতে পারে। তবে পরিমাণে খুব বেশি নয়। তা না হলে কিন্তু উল্টো সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। দারুচিনি দারুচিনিতে রয়েছে প্রাকৃতিক অ্যান্টাসিড যা হজম ক্ষমতার উন্নতি ঘটায়। এক গ্লাস জলে আধা চা–চামচ দারুচিনির পাউডার মিশিয়ে ফুটিয়ে নিন। দারুচিনি খেলে অ্যাসিডিটির সমস্যায় বেশ আরাম পাওয়া যায়। পাউডার খেতে অস্বস্তি লাগলে ৪-৫ টুকরো দারুচিনি দুই কাপ জলে জ্বাল দিয়ে নির্যাসসহ জলটা খাওয়া যেতে পারে। প্রতিদিন এভাবে তিনবার দারুচিনি মিশ্রিত জল পান করলেই আরাম পাওয়া যায়। মেথি এক গ্লাস জলে এক চা–চামচ মেথিগুঁড়া মিশিয়ে খেলে অ্যাসিডিটির জ্বালাপোড়া অনেকাংশে কমে যায়। অথবা এক চা–চামচ মেথি দানা এক গ্লাস জলে ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে সেটা খেলেও উপকার পাওয়া যায়। পুদিনাপাতা অ্যাসিডিটির সমস্যায় দু-তিনটি পুদিনাপাতা চিবিয়ে খেলে উপকার পাওয়া যায়। চিবিয়ে খেতে খারাপ লাগলে এক কাপ জলে কয়েকটি পুদিনাপাতা দিয়ে সেদ্ধ করে জলটা খাওয়া যেতে পারে। এতে বমিভাব, জ্বালাপোড়া দূর হয়। শরীর এবং মনকে সতেজ রাখতে পুদিনাপাতার জুড়ি নেই। পেঁপে পেঁপেতে থাকা ‘প্যাপেইন অ্যানজাইম’ আমাদের হজম প্রক্রিয়াকে সহজতর করে। ফলে অ্যাসিডিটির মতো সমস্যা হয় না। তাই প্রতিদিনের ডায়েটে রাখতে পারেন দু–এক টুকরা পেঁপে। আরও কিছু ঘরোয়া সমাধান কলায় প্রচুর পটাশিয়াম থাকে। যা প্রাকৃতিক অ্যান্টাসিড। তাই অ্যাসিড রিফ্লাক্সের বিরুদ্ধে এটি প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে। প্রতিদিন একটি করে কলা খেলেই আপনার গ্যাস-অম্বলের সম্ভাবনা অনেকটাই কমবে। তুলসীপাতা পাকস্থলিতে শ্লেষ্মার মতো পদার্থ উৎপাদন বাড়াতে উদ্দীপনা যোগায়। তুলসীপাতায় শীতলীকরণ এবং বায়ুনাশক উপাদান রয়েছে যা গ্যাস্ট্রিক বা অ্যাসিডিটির কার্যকারিতা কমাতে সহায়ক। গ্যাসের সমস্যা হলেই ৫-৬টি তুলসীপাতা চিবিয়ে খেয়ে ফেলুন। অথবা ৩-৪টি তুলসীপাতা সেদ্ধ করে সেই জলে একটু মধু মিশিয়ে খেলে চটজলদি আরাম পাওয়া যায়। তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাসিড কমিয়ে স্বস্তি দিতে পারে মৌরি। খাওয়ার পর মৌরি চিবিয়ে খেলে এই উপকার পাওয়া যায়। বদহজম এবং পেট ফাঁপার চিকিৎসায়ও এটি বেশ কার্যকর। এক গ্লাস জলে কয়েকটি মৌরি সারারাত ভিজিয়ে রেখে সকালে খালি পেটে তা পান করলে শরীর ঠান্ডা থাকবে এবং গ্যাস অম্বলের সম্ভাবনাও কমবে। টক দইয়ে থাকা ক্যালসিয়াম পাকস্থলীতে অ্যাসিড জমা হওয়া প্রতিরোধ করে। এর সঙ্গে গোলমরিচ যোগ করলে আরো ভালো ফল পাওয়া যাবে। টক দইয়ের ল্যাকটিক অ্যাসিড হজম প্রক্রিয়াকেও শক্তিশালী করে। লবঙ্গ পাকস্থলীর গ্যাস উৎপাদন প্রতিরোধ করে। প্রতিদিন দুটি লবঙ্গ চিবিয়ে খেলে উপকার হয়। ডাবের জল পাকস্থলীতে শ্লেষ্মা উৎপাদনে সহায়ক। যা পাকস্থলীতে অতিরিক্ত গ্যাস জমতে দেয় না। ফলে গ্যাস-অম্বলের সমস্যা দূর হয়। ঠাণ্ডা দুধ খেলে পাকস্থলির গ্যাস্ট্রিক অ্যাসিড স্থিতিশীল হয়ে আসে। দুধে ক্যালসিয়াম রয়েছে যা পাকস্থলীতে অ্যাসিড তৈরি প্রতিরোধ করে। তাই অ্যাসিডিটির সমস্যা হলেই এক গ্লাস ঠান্ডা দুধ পান করুন। এলাচ হজম ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। এটি অতিরিক্ত অ্যাসিড নিঃসরণের সম্ভাবনা দূর করে। গ্যাস অম্বলের সমস্যায় দুটি এলাচ গুঁড়ো করে জলে ফুটিয়ে খেলে উপকার পাবেন। অ্যাসিডিটির সমস্যা যদি প্রতিদিনই হয় এবং সেটা গুরুতর পর্যায়ের হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন। সব ঘরোয়া উপাদান সবার জন্য নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, আপনার যদি পেঁপে খেলে অ্যালার্জি দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই পেঁপে খাবেন না। মনে রাখবেন, এসব ঘরোয়া উপাদান কিংবা ওষুধ আমাদের অ্যাসিডিটি থেকে সাময়িক মুক্তি দিতে পারে। এই অস্বস্তিদায়ক সমস্যা থেকে সত্যিকারের মুক্তি পেতে চাইলে লাইফস্টাইল এবং ডায়েটে পরিবর্তন আনার কোনো বিকল্প নেই। একবারে অনেক না খেয়ে কিছুক্ষণ পরপর অল্প অল্প করে খান, পেট খালি রাখবেন না। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশুদ্ধ জল পান করুন। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। ভাজাবড়া কিংবা অতিরিক্ত তেল মসলাযুক্ত খাবার খাওয়ার অভ্যাস যদি ছাড়তে না পারেন, যতই ঘরোয়া দাওয়াই কিংবা ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন না কেন, অ্যাসিডিটি ঘুরেফিরে আপনার পিছু ছাড়বে না। সচেতনতার চেয়ে বড় দাওয়াই আর কিছু নেই। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ আয়ুশ মন্ত্রণালয় এবং প্রখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের এবং আয়ুর্বেদ চিকিৎসক দের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।