ডায়াবেটিস কিন্তু ছিনিয়ে নিতে পারে দৃষ্টিশক্তি জানেন কি স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ এই ডায়াবিটিসে ভুগেছিলেন দীর্ঘদিন। নিয়মিত চিকিৎসার পরেও এই রোগ থেকে নিষ্কৃতি পাননি তিনি। মাত্র ৩৯ বছর বয়সেই তিনি ইহলোকে চলে যান। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে কিছুই প্রায় দেখতে পেতেন না তিনি। তাই ডায়াবিটিসে যারা ভুগছেন তাদের অবশ্যই চোখের নিয়মিত চিকিৎসা এবং পরীক্ষানিরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশ্ব জুড়েই ডায়াবেটিস একটি বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। আপনার ডায়াবিটিস থাকলে চোখের রেটিনা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যা ডেকে আনে ডায়াবিটিস রেটিনোপ্যাথির মতো অসুখ। পরিমিত খাবার, শারীরিক শ্রম ও ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থ থাকা যায়। তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রোগটি শনাক্ত করা। অনেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী জানেন না যে তিনি রোগটি পুষছেন দীর্ঘদিন ধরেই। ডায়াবেটিস হলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। পরিমিত খাবার, শারীরিক শ্রম ও ক্ষেত্রবিশেষে ওষুধ সেবনের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়েও সুস্থ থাকা যায়। তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন রোগটি শনাক্ত করা। অনেক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী জানেন না যে রোগটি পুষছেন। তাই আগে জানা প্রয়োজন ডায়াবেটিস শরীরে বাসা বেধেছে কিনা! ডায়াবেটিস রোগের প্রধান লক্ষণগুলো ঘন ঘন জলের পিপাসা পাওয়া। ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া। অতিরিক্ত খিদে পাওয়া। দুর্বল লাগা বা ঘোর ঘোর ভাব আসা। সময়মতো খাওয়া-দাওয়া না হলে রক্তের শর্করা কমে হাইপো হওয়া। মিষ্টি জাতীয় জিনিসের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যাওয়া। কোন কারণ ছাড়াই অনেক ওজন কমে যাওয়া শরীরে ক্ষত বা কাটাছেঁড়া হলেও দীর্ঘদিনেও সেটা না সারা। চামড়ায় শুষ্ক, খসখসে ও চুলকানি ভাব। বিরক্তি ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠা। চোখে কম দেখতে শুরু করা। অন্যান্য উপসর্গ প্রধান লক্ষণগুলো ছাড়াও এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে নানা উপসর্গ দেখা যায়। এসব হলো শরীরে চুলকানি, বাত ব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘন ঘন চশমা বদল, পা জ্বালাপোড়া করা এবং অবশ বোধ করা, কাটা-ছেঁড়া সহজে না শুকানো। যদি আপনার এসব শারীরিক উপসর্গ থাকে তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কাদের ঝুঁকি আছে সাধারণত আমরা জানি ডায়েবিটিস দু'ধরণের। গবেষকরা জানাচ্ছেন, ডায়াবিটিস আসলে পাঁচ ধরণের। এ ছাড়া লক্ষণ না থাকলেও প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক লোকজনেরই ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। বিশেষ করে যাদের ওজন বেশি, কায়িক পরিশ্রম করে না যারা, যাদের বাবা-মা, ভাইবোনের ডায়াবেটিস আছে, যারা উচ্চ রক্তচাপের রোগী, যাদের রক্তে এইচডিএল কোলেস্টেরল ৩৫–এর নিচে এবং ট্রাইগ্লিসারাইড ২৫০–এর বেশি। যেসব নারীর গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস রোগ ধরা পড়েছিল ও যাঁদের হৃদ্রোগ রয়েছে। এছাড়া যারা নিয়মিত হাঁটাচলা বা শারীরিক পরিশ্রম করেন না, অলস বা অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন করেন, তাদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। এছাড়া নারীদের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস রোগ হতে পারে। যাদের হৃদরোগ রয়েছে, রক্তে কোলেস্টেরল বেশি, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে, তাদেরও এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। যেসব শিশুর ওজন বেশি, যাদের বাবা-মা, ভাই-বোন, দাদা-দাদী, নানা-নানী বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনের ডায়াবেটিস রয়েছে। যাদের মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয়েছিল, সেই সব শিশুর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের বাবা-মা, ভাই-বোন বা ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের এই রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি রয়েছে। যেসব শিশুর ওজন বেশি, যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি, পিসী, ভাই-বোনের ডায়াবেটিস আছে, যাদের শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার লক্ষণ দেখা দিয়েছে, যাদের জন্মের সময় ওজন কম ছিল এবং যেসব শিশুর মায়ের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ধরা পড়েছে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস গর্ভাবস্থায় কখন ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন তা অনেকেই জানেন না। এ ক্ষেত্রে গর্ভধারণের পরপরই একবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করতে হবে পাশাপাশি গর্ভকালীন ২৪-২৮ সপ্তাহের সময়ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন। যাদের গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হয় তাঁদের প্রসবের ছয়-বারো সপ্তাহ পর পরীক্ষা করতে হবে। ডায়াবিটিস কিভাবে চোখের ক্ষতি করতে পারে! ডায়াবিটিস রোগটি বড়ই ভয়ঙ্কর। আপনার অজান্তেই এই রোগ শরীরের অন্দরে নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে চোখেও। বৃদ্ধ বয়সে অনেকেই চোখে ঝপসা দেখেন। সে ক্ষেত্রে মনে হতেই পারে হয়েতো চোখে ছানি পড়েছে। সাবধান! আপনার ডায়াবিটিস থাকলে চোখের রেটিনা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যা ডেকে আনে ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির মতো অসুখ। তাই ডায়াবিটিসের চিকিৎসার সঙ্গে নিয়মিত চোখের পরীক্ষা করাও জরুরি। এই রোগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে চোখের রেটিনার অংশে রক্তবাহী সরু ধমনীগুলি দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে এক প্রকার ফ্লুইডের ক্ষরণ শুরু হয়। দৃষ্টিশক্তি কমে যায়। এর পরবর্তী পর্যায়ে ধমনীতে রক্ত চলাচলের সমস্যা আরও বাড়ে। রেটিনার বিভিন্ন অংশে ঠিকমতো অক্সিজেন পৌঁছতে পারে না। চোখে রক্তক্ষরণ শুরু হয়, ডাক্তারি পরিভাষায় এই সমস্যাকে বলা হয় ভিট্রিয়াস হেমারেজ। এর থেকে চোখে অন্ধত্বও আসতে পারে। ডায়াবেটিক রেটিনোপ্যাথির লক্ষণগুলি ১) এ ক্ষেত্রে অনেক ডায়াবিটিস রোগীর ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়।২) এই সমস্যায় আক্রান্তদের কিছু পড়তে বা দূরের জিনিস দেখতে সমস্যা হয়। তাই হঠাৎ করে এমনটা হলে অবশ্যই চিকিৎসকের নজরে আনুন।৩) ডায়াবিটিক রেটিনোপ্যাথির সমস্যা বাড়তে শুরু করলে অনেকের রং দেখতেও সমস্যা হয়।৪) চোখে স্বাভাবিক দেখতে দেখতে হঠাত্ করেই চার দিকটা অন্ধকার দেখায়। আবার কেউ কেউ নির্দিষ্ট কোনও অংশ দেখতে পান না।৫) চোখের সামনে পোকার মতো কিছু ঘুরে বেড়াচ্ছে মনে হওয়া বা আচমকা আলোর ঝলকানিও এই রোগের লক্ষণ। কী করবেন? এই ধরনের লক্ষণ দেখা দিলেই দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। রোগ কতটা থাবা বসিয়েছে তা পরীক্ষা নিরীক্ষা করেই চিকিৎসা শুরু হবে। এ ক্ষেত্রে রেটিনা সার্জনরা সাধারণত বেশ কয়েকটি পরীক্ষা করান। এগুলির মধ্যে রয়েছে অ্যাঞ্জিওগ্রাফি , চোখের স্ক্যান। লেজার থেরাপি, চোখের ইঞ্জেকশন বা স্টেরয়েড ইঞ্জেকশন দিয়ে দৃষ্টিশক্তি আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, যে সব ডায়াবিটিস রোগীরা রক্তে, রেনাল প্রোফাইল (ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন), রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তাঁদের চোখের সমস্যা অনেক কম হয়। খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ আর এক্সারসাইজ করলে এগুলি ঠিক রাখা সম্ভব। সেই সঙ্গে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতেও ভুলবেন না। সামান্য গাফিলতি বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে আপনার চোখের। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সাথে সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখিত।