কোলন ক্যান্সার বা মলাশয়ের ক্যান্সার বিভিন্ন ক্যান্সারজনিত কারন যেমন পরিবেশ বা বংশগত প্রভাবের কারণে মলাশয়ের মিউকোসাল এপিথেলিয়ামের টিউমারটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমারে পরিণত হলে তখন তাকে কোলন বা মলাশয়ের ক্যান্সার বলে। এটি সাধারণত মলাশয় এবং মলদ্বারের সংযোগস্থানে হয়। সম্ভাবনার দিক দিয়ে গ্যাস্ট্রিক, খাদ্যনালী এবং কোলন ক্যান্সারের মধ্যে এর স্থান দ্বিতীয়। সাধারণত ৪০-৫০ বছর বয়সী রোগীদের ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার বেশী দেখা যায়। এবং ৪০ বছরের নিচে কোলন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা১৫%। পুরুষ এবং নারী ভেদে এর অনুপাত হল ২ঃ১। কোলন ক্যান্সার কারন ১. খাদ্যাভ্যাস বা ডায়েটঃ চর্বি জাতীয় খাবার বেশী এবং আঁশ জাতীয় খাবার কম খেলে এই ক্যান্সার হতে পারে। ২. বংশগত প্রভাবঃ পূর্বে পরিবারের কারো এই ক্যান্সার হয়ে থাকলে অন্যদেরও হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ৩. কোলন পলিপসঃ মলদ্বার বা মলাশয়ের ভেতরকার দেয়ালে পলিপ্স জন্মায় যা প্রথম দিকে বিনাইন টিউমার হিসেবে থাকে কিন্তু পরবর্তীতে ম্যালিগন্যান্ট হয়ে যেতে পারে। ৪. আলসার জনিত প্রদাহঃ যাদের আলসার জনিত প্রদাহ থাকে তাদের ক্ষেত্রে এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা অন্যদের থেকে ৩০ গুন বেশী থাকে, কোলন ক্যান্সার সাধারণত কাদের হয় ১. বংশে কারো পলিপোসিস হবার ইতিহাস থাকলে অন্যদের কোলন ক্যান্সার হতে পারে। ২. কারো বাবা-মা, ভাই-বোনের এই ক্যান্সার হয়ে থাকলে তারও হতে পারে।৩. দীর্ঘদিনযাবৎ আলসারের ব্যথায় ভুগলে এই ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা থাকে।৪. ক্রনিক ডায়রিয়া এবং কোষ্ঠকাঠিন্য এর কারনেও এই ক্যান্সার হতে পারে।কোলন ক্যান্সারের লক্ষণ কি? ১. পায়খানার সাথে লাল বা গাঢ় লাল রঙের রক্ত দেখা গেলে।২. পেত ব্যথা বা ফেঁপে ওঠা, হজমে সমস্যা ও অরুচি।৩. পায়খানায় যে কোন ধরনের পরিবর্তন যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য,ঘন ঘন পায়খানা এমনকি ডায়রিয়া।৪.স্বাভাবিক এর থেকে অতিরিক্ত পায়খানা হলে। ৫. মলাশয়ে ঘা বা অনবরত পেট ব্যথা।৬. লিভার জনিত বিভিন্ন অসুখ যেমন জন্ডিস, লিভারে পানি জমা হওয়া ইত্যাদি। কিভাবে কোলন ক্যান্সার নির্ণয় করা হয়? ১. ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামঃ এক্ষেত্রে ডাক্তার পায়ু পথ হাত দিয়ে পরীক্ষা করেন যে কোন মাংসপিণ্ড আছে কিনা।২. ফেকাল অকাল ব্লাড টেস্টঃ এই পদ্ধতিতে পায়খানার সাথে রক্ত গেলে তা পরীক্ষা করে জানা যায় কোন ক্যান্সার কোষ আছে কিনা। যদি অনেকগুলো পরীক্ষার পরও কোন ক্যান্সার ধরা না পড়ে তাহলে বুঝতে হবে হজম প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট কোন প্রত্যঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে দ্রুত অন্য পরীক্ষা করাতে হবে।৩. এক্স-রে টেস্টঃ এর মাধ্যমে হজম প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রত্যঙ্গ গুলোতে কোলন এর অস্তিত্ব বোঝা যায়। সেখানে একাধিক পলিপ বা ক্যান্সারের একাধিক কেন্দ্র বিন্দু আছে কিনা তাও জানা যায়।৪. কোলনোস্কপিঃ মলের সাথে রক্ত দেখা গেলে, পায়খানায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেলে এবং ডিজিটাল রেক্টাল এক্সামের পর পসিটিভ ফল আসলে সেক্ষেত্রে এই পরীক্ষা করা হয়। মলাশয়ে কোন ক্ষত আছে কিনা তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয় এবং কোন ক্ষত পাওয়া গেলে ঐ অংশের টিস্যু নিয়ে বায়প্সি করা হয়।৫. আলট্রাসনোগ্রাফি, সি.টি. স্ক্যান, এম.আর.আই.: এগুলোর মাধ্যমে সরাসরি ক্যান্সার সনাক্ত করা না গেলেও ক্যান্সারের উৎস, কেন্দ্রস্থল, আকৃতি ইত্যাদি নির্ণয় করা যায়। কোলন ক্যান্সারের বিভিন্ন পর্যায়ঃ স্টেজ০: এই ধাপে মলদ্বারের সংলগ্ন টিস্যু গুলোতে অস্বাভাবিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। একে ক্যান্সারের প্রাথমিক পর্যায় ও বলা হয়।স্টেজ ১: এই ধাপে ক্যান্সার মলদ্বারের উপরিস্থল ভেদ করে দ্বিতীয় স্তরে প্রবেশ করে।স্টেজ ২: এই ধাপে ক্যান্সার মলদ্বারের পেশী পর্যন্ত পৌছায় কিন্তু লসিকা গ্রন্থি পর্যন্ত তখনও পৌছায় না।স্টেজ ৩: এই ধাপে ক্যান্সার লসিকা গ্রন্থিতে পৌঁছে যায় কিন্তু শরীরের অন্যান্য অংশে তখনও পৌছায় না।স্টেজ ৪: এই ধাপে ক্যান্সার অন্যান্য অংশ যেমন লিভার, ফুসফুস, জরায়ু, পেটের পর্দা প্রভৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে।পুনরাবৃত্তিঃ ট্রিটমেন্টের পর আবারও কোলন ক্যান্সারের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কোলন ক্যান্সারের কি কি চিকিৎসা আছে? ১. সার্জারিঃ এটি কোলন ক্যান্সারের জন্য খুবই প্রচলিত একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যান্সার রোগীদের ক্ষেত্রে করা হয়। এর মাধ্যমে মলদ্বারের কিছু অংশ অথবা সম্পূর্ণ মলদ্বারই কেটে ফেলা হয়। ২. রেডিয়েশন থেরাপিঃ এটি সাধারণত সার্জারির পর দেওয়া হয় যাতে ক্যান্সার কোষ গুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়।৩. কেমোথেরাপিঃ এটিও ক্যান্সার কোষ পুরোপুরি ধ্বংস করতে এবং পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সার্জারির পর দেওয়া হয়।৪. বায়োলজিক্যাল ইমিউনোথেরাপিঃ এটি ব্যথা এবং জটিলতা মুক্ত একটি থেরাপি যা রেডিও থেরাপির ফলে সৃষ্ট পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দূরীকরণের সাথে সাথে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও শক্তিশালী করে। অপারেশনের পর রোগীর কি কি যত্ন নিতে হবে? ১. পোশাক-পরিচ্ছদঃ খুবই হালকা এবং আরামদায়ক পোশাক পরতে হবে এবং বেল্ট ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাড়তি সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। ২. গোসলঃ সম্পূর্ণ ক্ষত সেরে যাওয়ার পর রোগীকে গোসল করানো যেতে পারে।৩. ডায়েটঃ রোগীকে পুষ্টিকর খাবারের সাথে তাজা ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়াতে হবে।৪. ব্যায়াম ঠাণ্ডার সহনশীলতা বাড়াতে এবং শরীরকে স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় ব্যায়াম করতে হবে।৫. মানসিক সাহায্য রোগীকে হতাশা ও দুশ্চিন্তা মুক্ত রাখতে হবে এবং সে যেন সব সময় হাসি খুশি থাকে তার ব্যবস্থা করতে। সুত্রঃ বিকাশপিডিয়া টীম পশ্চিমবঙ্গ