সজনে বা সজিনা কে আমরা অনেকেই চিনে থাকি সবজি হিসাবে। কিন্তু সজনে সবজি ছাড়াও সজনের পাতাকে শাক হিসাবেও খাওয়া যেতে পারে। কারণ সজনের পাতায় প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন রয়েছে যা আমাদের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কাজ করে থাকে। বহুবিধ গুণসম্পন্ন সজনে, পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিকর হার্ব। সজনে তিন ধরনের হয় নীল সজনে, শ্বেত সজনে ও রক্ত সজনে। ড্রামস্টিক, মরিঙ্গাসহ দেশ-বিদেশে সজনের বিভিন্ন নাম রয়েছে। এর কাঁচা লম্বা ফল সবজি হিসেবে খাওয়া হয় যা মূলত সজনে ডাঁটা নামে পরিচিত। দেশের সর্বত্রই এই সবজিকে আমরা দেখতে পাই। বিশেষ করে গ্রামের রাস্তার ধারে এবং বসত বাড়ির উঠোনে যত্ন ছাড়াই বেড়ে ওঠে এ বৃক্ষটি। সজনের পুষ্টিগুণ সমূহ সজনে ডাঁটার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে পুষ্টিগুণ রয়েছে যা আমাদের শরীরের বিভিন্ন ভিটামিনের চাহিদা পূরণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে কাজ করে থাকে। সজনের মধ্যে রয়েছে শর্করা, আমিষ, ভিটামিন-এ, ভিটামিন-বি, ভিটামিন-বি২, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক এবং আরো অনেক ধরনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা আমাদের শরীরকে সুস্থ রাখতে কাজ করে থাকে। সজনের ঔষধি গুন সমূহ সজনের মধ্যেই যে ভিটামিন এর উপস্থিতি আমরা লক্ষ্য করেছি শুধু এই ভিটামিনের মধ্যেই কিন্তু সজনে সীমাবদ্ধ নয়। এর কিছু ঔষধি গুণাগুণ রয়েছে। মোটামুটি ভাবে বলতে গেলে বলা যায়, সজনে গাছের শেকড় থেকে গাছের বাকল, সজনে ডাঁটা, সজনে পাতা, সজনের ফুল, ফল এমনকি সজনে গাছের আঠা থেকেও বিভিন্ন ধরনের ওষুধ বা প্রতিষেধক তৈরি করা হয়ে থাকে। মাতৃ দুগ্ধ উৎপাদনে সজনের উপকারিতা মাতৃ দুগ্ধ উৎপাদনে সজনের উপকারিতা অনেক বেশি। যে সকল মহিলারা সদ্য মা হয়েছেন তারা অনেকেই তাদের বাচ্চাদেরকে পরিপূর্ণ স্তনদুগ্ধ দিতে পারে না। এ সময় প্রসূতি মায়েদেরকে সজনের ডাঁটা অথবা সজনের শাক খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন চিকিৎসকরা। যেহেতু সজনে পাতার মধ্যে এবং সজনে ডাঁটার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে আয়রন ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন বি কমপ্লেক্স রয়েছে, তাই সন্তানের জন্মের পরে সজনে এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি খাওয়ার মাধ্যমে মায়েরা তাদের বাচ্চাদের কে পর্যাপ্ত স্তন্য দুগ্ধ দিতে সক্ষম হবে। দৈনিক ৬ চামচ সজনে পাতার গুঁড়া একটি গর্ভবর্তী বা স্তন্যদাত্রী মায়ের চাহিদার সবটুকু ক্যালসিয়াম ও আয়রন সরবরাহ করতে সক্ষম। লিভারের সমস্যা সমাধানে সজিনার উপকারিতা যাদের লিভারের সমস্যা রয়েছে, যেমন লিভারে কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়া, লিভার বড় হয়ে যাওয়া, অথবা হজমে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়, তাহলে এই ধরনের সমস্যা সমাধান করার জন্য আমরা প্রতিষেধক হিসাবে এই সজনে কে বেছে নিতে পারি। কারণ সজনের মধ্যে থাকা ফাইবার আমাদের লিভারের সমস্যা সমাধানে কাজ করে থাকে। পাশাপাশি সজনেডাঁটার মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম ও আয়রন রয়েছে যা আমাদের রক্ত শূন্যতা পূরণ করতে কাজ করে থাকে। পুরুষত্ব বাড়াতে সজনের উপকারিতা বয়স বাড়ার কারণে অথবা বিভিন্ন ধরনের সমস্যার কারণে অল্প বয়সে যাদের পুরুষত্বে সমস্যা চলে আসে, তারা কিন্তু সজনে ডাঁটা বা সজনের বাকল কে প্রতিষেধক হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। এছাড়াও কিডনির সমস্যার সমাধানে সজনের উপকারিতা রয়েছে। সজনে হজমে সহায়তা করার পাশাপাশি এটি আমাদের কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতেও কাজ করে থাকে। সজনের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য উপকারিতা সজনের আরো কিছু উল্লেখযোগ্য উপকারিতা রয়েছে। যেমন যদি আমরা নিয়মিত খাবারের তালিকায় সজনেডাঁটা বা সজনের পাতাকে শাক হিসেবে রাখতে পারি, এটি আমাদের কিডনি সমস্যার সমাধানে কাজ করবে। যাদের খুশকি জাতীয় সমস্যা রয়েছে তারা সজনে পাতা কে পেস্ট করে মাথায় লাগালে খুশকি দূর হয়ে যায়। এছাড়াও সজনে কৃমিনাশক হিসেবে সমস্যা সমাধানে কাজ করে থাকে। ঔষধিগুণ সজনে সবজিতে ক্যালসিয়াম, খনিজ লবণ আয়রণসহ প্রোটিন ও শর্করা জাতীয় উপাদান রয়েছে। এ ছাড়া ভিটামিন এ, বি, সি, সমৃদ্ধ সজনে ডাঁটা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত উপকারি। সজনের বাকল, শিকড়, ফুল, ফল, পাতা, বীজ এমনকি এর আঠাতেও ওষুধি গুণ আছে। সজনে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে। সজনের ডাঁটা পক্স বা বসন্ত রোগের প্রতিরোধক হিসেবে খুবই উপযোগী। শ্বাসকষ্ট, মাথাধরা এবং মাইগ্রেন চিকিৎসায় সজনে ভাল কাজ করে। সজনের কচি পাতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর পাতা শাক হিসেবে ব্যবহার করা যায়, এতে শারীরিক শক্তি ও আহারের রুচির উন্নতি হয়। পোকার কামড়ে অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে সজনে পাতার রস ব্যবহার হয়। শরীরের পুষ্টির জন্য গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ করে বলে সজনে ডাঁটা ঔষধি সবজি হিসাবেও এর চাহিদা অপরিসীম। এছাড়া গাছের বাকল ও পাতা রক্তামাশায় পেটের পীড়া, উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে মাথা ব্যথায় সজনের কচি পাতা কপালের দুই পাশে ঘষলে ব্যথা উপশম হয়। সজনে গ্যাস্টিক রোগের বায়ুনাশক হিসেবে কাজ করে। পাতার রস হৃদরোগ চিকিৎসায় এবং রক্তের প্রবাহ বৃদ্ধিতে ব্যবহার হয়। শ্বেতীরোগ, টাইফয়েড জ্বর, প্যারালাইসিস এবং লিভারের রোগে সজনের রস উপকার। ক্ষতস্থান সারার জন্য সজনে পাতার পেষ্ট কার্যকরি। ভারত, চীনসহ পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশে সজনে পাতার পাউডার দিয়ে তৈরি ক্যাপসুল বাণিজ্যিক ভাবে বাজারজাত করছে। তবে সজিনা শুধু পুষ্টিকর সবজি নয়, এটি ঔষধি বৃক্ষও বটে। এছাড়া সজিনার ফুল ও পাতা শুধু শাক হিসেবেই নয়, পশু খাদ্য হিসেবেও ব্যবহার হয়ে থাকে। সজনের বহুমুখী ব্যবহার সজনে গাছকে বলা হয় পুষ্টির গাছ। সজনের পুষ্টিগুণ ব্যতিক্রমধর্মী। আমিষের অনুপাত বিবেচনায় সজনের গাছকেই পৃথিবীর সেরা গাছ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই গাছের প্রায় সব অংশই ব্যবহার করা যায়। বহুবিধ খাদ্যগুণসম্পন্ন হওয়ায় দক্ষিণ আফ্রিকায় সজিনা গাছকে ‘জাদুর গাছ’ হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই গাছের প্রায় সব অংশই উপকারী। পাতা সজনে গাছের পাতাকে বলা হয় অলৌকিক পাতা। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুষ্টিকর হার্ব। গবেষকরা সজনের পাতাকে বলে থাকেন নিউট্রিশিয়াস সুপার ফুড। নিরামিষভোগীরা সজিনার পাতা থেকে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হতে পারেন। পরিমাণের ভিত্তিতে তুলনা করলে একই ওজনের সজিনা পাতায় কমলা লেবুর ৭ গুণ ভিটামিন-সি, দুধের ৪ গুণ ক্যালসিয়াম এবং দুই গুণ আমিষ, গাজরের ৪ গুণ ভিটামিন-এ, কলার ৩ গুণ পটাশিয়াম বিদ্যমান। বিজ্ঞানীরা আরও বলেন, সজিনা পাতায় ৪২% আমিষ, ১২৫% ক্যালসিয়াম, ৬১% ম্যাগনোসিয়াম, ৪১% পটাশিয়াম, ৭১% লৌহ, ২৭২% ভিটামিন-এ এবং ২২% ভিটামিন-সি সহ দেহের আবশ্যকীয় বহু পুষ্টি উপাদান থাকে। এক টেবিল চামচ শুকনা সজিনা পাতার গুঁড়া থেকে ১-২ বছর বয়সী শিশুদের অত্যবশ্যকীয় ১৪% আমিষ, ৪০% ক্যালসিয়াম ও ২৩% লৌহ ও ভিটামিন-এ সরবরাহ হয়ে থাকে। ফুল সজিনার ফুল বসন্তকালে খাওয়া ভাল কারণ এটি বসন্ত প্রতিষেধক। এটি সর্দি কাশিতে, যকৃতের কার্যকারীতায়, কৃমি প্রতিরোধে, শক্তি বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। ডাঁটা এর ডাঁটা বা ফলে প্রচুর অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে। এটি বাতের রুগীদের জন্য ভালো। বীজ এর বীজ থেকে তেলও পাওয়া যায়, যা বাতের ওষুধ তৈরির কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে এবং ঘড়ি ঠিক করার জন্য যে বেন ওয়েল (Ben oil) ব্যবহার হয় তা এর বীজ হতে পাওয়া যায়। ছাল সজিনার ছাল থেকে তৈরি হয় দড়ি এবং আরও নানা কাজে ব্যবহৃত হয় সজনের ছাল বা বাঁকল। লেখকঃ রাজীব দত্ত তথ্য সুত্রঃ আয়ুশ মন্ত্রণালয়।