আয়ুর্বেদের ভেষজ গুনগুলির মধ্যে আমলকী একটি জনপ্রিয়, মূল্যবান, সহজলভ্য এবং পরীক্ষিত একটি ফল বা ভেষজ। ধনী দরিদ্র, সুস্থ্য-অসুস্থ্য এবং সব বয়সের মানুষই কিন্তু এই আমলকী খেতে পারেন। আমলকী পুষ্টি সাধন করে এবং স্তনবৃদ্ধি করে বলে একে ধাত্রী বলা হয়। অকাল বার্ধক্য রোধ করে বলে বয়াস্থা, রুচি বাড়ায় বলে রোচনী, বৃষ বা শুক্রের বৃদ্ধি করে বলে বৃষ্যা ইত্যাদি নামে পরিচিত। আমলকীর উপাদান আমলকীতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, বি, আয়রন, ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, অ্যামাইনো অ্যাসিড, গ্যালিক অ্যাসিড, ট্যানিন, পলিফেনল, সাইকোটাইনিন, কিমফেরল, ফাইবার অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, অ্যালকালয়েড, ফাইলানটিন, ফাইলেমবিন, ফাইলেনটিডিন প্রভৃতি রয়েছে। আমলকীর উপকারিতা আমলকী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। দুর্বলতা নাশ করে। লিভার সুস্থ রাখে। হজম শক্তি বাড়ায় কোষ্ঠ-কাঠিন্য থেকে মুক্তি দেয় সর্দি-কাশি প্রতিরোধ করে গলার স্বর ভালো রাখে ফুসফুসের ক্ষমতা বাড়ায় রক্ত পরিষ্কার রাখে, রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে চুলের বৃদ্ধি ঘটায় ত্বকের সৌন্দর্য বাড়ায় হার্ট ভালো রাখে এবং মজবুত করে মনঃসংযোগ বাড়ায় জরা- বার্ধক্য রুখতে সাহায্য করে ক্যানসার প্রতিরোধ করে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে আমলকীর পরম্পরাগত ব্যবহার ১) পেটের সমস্যায় আমলকী- অম্বল, অজীর্ণ, অরুচি, ক্ষুধামান্দ, বমি ভাব ইত্যাদি পেটের সমস্যায় দারুন কাজ করে। পাচ-ছয় গ্রাম আমলকী রাতে ১০০ মিলি জলে ভিজিয়ে সকালে নিয়মিত পান করলে দারুন উপকার পাওয়া যায়। ২) রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বারায়- যারা বারে বারে সর্দি, কাশি প্রভৃতিতে ভোগেন তারা যদি তিন থেকে চার গ্রাম আমলকী রাতে ১০০ মিলি জলে ভিজিয়ে সকালে খেতে পারেন খালিপেটে তাহলে দারুন উপকার পেতে পারেন। অনেকে চ্যাবনপ্রাশ খেয়ে থাকেন। কিন্তু চ্যাবনপ্রাশের প্রধান উপাদানই আমলকী। ৩) অ্যালার্জি- কোন খাবার খেলে শরীরে লাল চাকা চাকা হয়ে ফুলে উঠে এবং চুলকুনি হয়। নিমপাতা চূর্ণ এক ভাগ, হলুদ চূর্ণ দু’ভাগ, আমলকী চূর্ণ এক ভাগ এক সঙ্গে মিশিয়ে দু’গ্রাম মাত্রায় সকাল ও সন্ধ্যায় খালিপেটে ঠাণ্ডা জলে খেতে পারলে দারুন উপকার পাওয়া যায়। ৪) ওজন কমাতে দারুন উপকারি আমলকী- আমলকী, হরিতকী, বহেড়া সামান্য মাত্রায় মিশিয়ে (একে ত্রিফলা বলে) তিন থেকে পাঁচ গ্রাম দু’কাপ জলে ভালো করে ফোটাতে হবে। কাপ হলে এই মিশ্রণ তা উনান থেকে নামিয়ে ছেঁকে তাতে এক চামচ মধু ও ১/৪ চামচ আদার রস ও লেবুর রস মিশিয়ে সকালে খালি পেতে খেলে ওজন কমে যায়। ৫) লিউকেমিয়া- আমলকী চূর্ণের সাথে এক থেকে দেড় গ্রাম মধু মিশিয়ে সকাল, সন্ধ্যা এবং রাতের খাওয়ার আগে খেলে দারুন উপকার পাওয়া যায়। ৬) দৃষ্টি ক্ষীণতায়- অল্প বয়সে যাদের দৃষ্টি শক্তি কম তারা দু-তিন চামচ আমলকীর রস সকালে খালিপেটে খেলে তাদের দৃষ্টি শক্তি বৃদ্ধি পেতে পারে। চোখের জন্যে দারুন উপকারি আমলকী। ৭) স্মৃতিশক্তি বাড়াতে আমলকী- শিশুদের স্মৃতি ও মেধা বৃদ্ধিতে আমলকী দারুন কার্যকরী। আমলকীর গুনাগুণ সবচেয়ে বেশী থাকে নভেম্বর এবং ডিসেম্বর মাসে। আমলকী থেকে চ্যবনপ্রাশ, ধাত্রীলৌহ, ধাত্রীরসায়ন, ব্রাহ্মরসায়ন, ত্রিফলা চূর্ণ জাতীয় আয়ুর্বেদিক ঔষধি তৈরি হয়। কিভাবে খাবেন আমলকী প্রতিদিন এক থেকে দুটি আমলকী কাঁচা চিবিয়ে অথবা রস করে খাওয়া সবচেয়ে ভালো এবং উপকারি। আমলকী কেটে নূন মিশিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। তবে তাতে ভিটামিন-সি নষ্ট হয়ে যায়। শুঁকনো আমলকী গুড়ো করে বা রাতে জলে ভিজিয়ে সকালে খাওয়া যায়। এছাড়া দুপুরে এবং রাতে খাবার পর খাওয়া যেতে পারে। সতর্কতা আমলকীতে অক্সালেট বেশী থাকায় কিডনিতে পাথর জনিত রোগ থাকলে কম খাওয়াই ভালো। এছাড়া আমলকী খেলে জল স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশী খেতে হবে। বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসা আমলকীর গুনাগুণ আমলকী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় কারন আমলকীর মধ্যে ভিটামিন-সি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শ্বেত রক্তকণিকা বাড়ায়। আমলকী রক্তাল্পতা রোধ করে কারন আমলকী থাকা ভিটামিন-সি আয়রন শোষণে সাহায্য করে।উচ্চ রক্তচাপ কমায়। কারন এর মধ্যে থাকা ভিটামিন-সি। তবে ত্রিফলা হিসেবে খেলে বেশী উপকার। আমলকী খারাপ কোলেস্টেরল কমায় কারন আমলকীতে থাকা গ্যালিক অ্যাসিড ও পেকটিন।আমলকী হার্টের রোগ প্রতিরোধ করে কারন এরমধ্যে থাকা ভিটামিন-সি রক্ত সঞ্চালন ভালো রাখে, হার্টের মাসলের শক্তি যোগায়। ডায়াবেটিস কমাতে আমলকীর জুড়ি নেই। কারন গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকী ইনসুলিন উৎপাদন এবং ক্ষরণ বাড়ায়। আমলকী ডায়েবিটিস জনিত চোখের রোগ প্রতিরোধ করে। দেহে উপস্থিত অ্যালডোজ রিডাকটেজ উৎসেচকের মাত্রা কম করে। আমলকী বাতের ব্যাথা কমাতেও দারুন উপকারি কারন, আমলকী ইনফ্লামেশন কমিয়ে ব্যথা কমায়। আলসার কমাতে দারুন কাজ করে আমলকী। কারন এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি র্যাডিকেলাস থেকে কোষকে রক্ষা করে। আমলকী ত্বক চুল সুরক্ষিত রাখে। এর গ্লাইসিন, ট্যানিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্রি র্যাডিকেলাসকে ধ্বংস করে ত্বক এবং চুলের লাবন্যতা এবং সতেজতা রক্ষা করে। আমলকী ক্যানসারের মতো রোগ প্রতিরোধ করে। কারন আমলকী ফ্রি র্যাডিকেলাসকে শরীরের বাইরে বের করে দেয়। আমলকী অকাল বার্ধক্য রোধে ভীষণ কার্যকরী। আমলকী ত্বকের প্রোকোলাজেন বাড়িয়ে বলিরেখা পড়তে বাধা দেয়। আমলকী স্মৃতি শক্তি বাড়তে সাহায্য করে। কারন আমলকী ব্রেনের কলিন এস্টারেজ বাড়ায়। বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক গ্রন্থ অনুযায়ী আমলকীর ব্যাবহার চরক সংহিতা- হিক্কাঃ আমলকীর রস, কয়েদ বেলের রস, পিপুল মধু সহ খেতে হবে (চিকিৎসা স্থান- ২১ অধ্যায়) । শ্বেত প্রদর বা লিউকোরিয়াঃ আমলকীর বীজ বা চূর্ণ বা রস মধুর সাথে (চিকিৎসা স্থান- ৬ অধ্যায়) । সুশ্রুত- অর্শঃ আমলকী পিষে মাটির পাত্রে রেখে ঘোল করতে হবে। ঐ ঘোল পান করতে হবে (চিকিৎসা স্থান- ৬ অধ্যায়) । প্রমেহঃ আমলকী কাঁচা বা রস করে খেতে হবে (চিকিৎসা স্থান- ১১ অধ্যায়) । বাগভট্ট- কাশঃ আমলকী চূর্ণ দুধ ও ঘি এর সাথে পান করতে হবে (চিকিৎসা স্থান- ৩ অধ্যায়) । প্রমেহঃ মধু সহ আমলকীর রস পান করতে হবে (চিকিৎসা স্থান- ১২ অধ্যায়) । লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক)। তথ্য সুত্রঃ স্টেট আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল সুত্রে লিখিত। আয়ুশ মন্ত্রণালয়, ভারত সরকার।