খাদ্যে সাংঘাতিক পরিমাণে ভেজালের কারনে আজকের দিনে প্রচুর মানুষ পেটের সমস্যায় ভুগছেন, কারও আবার পেট ফাঁপা, গ্যাসের সমস্যা। এর পাশাপাশি আমাদের রোজকার জীবনশৈলী এবং কিছু খারাপ অভ্যাসের কারনে এবং অনিয়মের কারনে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভুগি। অ্যাসিডিটির সমস্যা থাকলে দেখা যায় কিছু না খেলেও ঢেঁকুর ওঠে। কখনও কখনও টক ঢেঁকুর ও ওঠে, গলা-বুক জ্বলছে। শরীরেও অস্বস্তি হয়। আপাতভাবে সমস্যাটা তেমন গুরুতর মনে না হলেও যারা নিয়মিত ভুক্তভোগী তারা জানেন অ্যাসিড রিফ্লাক্সের ঝামেলা ঠিক কতটা অস্বস্তিকর। চটজলদি আরাম পেতে সবার ভরসা অ্যান্টাসিড। একটানা ওষুধ খেয়ে গেলে যে শরীরে অন্য কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে, তার তোয়াক্কাই করেন না কেউ কেউ। তবে কথায় কথায় গ্যাস অম্বলের সমস্যা আর মুঠো মুঠো নিজের ইচ্ছেমতো ওষুধ খেয়ে তার সমাধান কিন্তু মোটেই ভাল অভ্যাস নয়। কিন্তু একটু সচেষ্ট হলেই এই অ্যাসিডিটির সমস্যাটা নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব। রোজকার জীবনধারায় সামান্য পরিবর্তন এবং খাদ্যতালিকায় কিছু খাবার সংযোজন করলেই নিত্যদিনের এই সমস্যা থেকে স্বস্তি পাওয়া যেতে পারে। শুধু তাই নয়, সামান্য কিছু নিয়মবিধি মেনে চললেই কয়েকদিনের মধ্যে গ্যাস অম্বলের চিরবিদায় হতে পারে। তবে এজন্যে বেশ কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। তবে তার আগে জেনে নেওয়া দরকার অ্যাসিড রিফ্লাক্স কেন হয়। কেন হয় অ্যাসিডিটি আমাদের খাদ্যনালী (ইসোফেগাস) খাবার ও পানীয় বয়ে নিয়ে যায় পাকস্থলীতে (স্টম্যাক)। এই গতিটা হয় নিম্নমুখী। সাধারণ পরিস্থিতিতে উপরের দিকে অ্যাসিডের উঠে আসার কথা নয়। অ্যাসিড খাবার হজম করার জন্যে নিঃসৃত হয় এবং পাকস্থলীর দিকেই যায়। পাকস্থলীর গ্যাসট্রিক গ্ল্যান্ডে অতিরিক্ত অ্যাসিড নিঃসরণের ফলে অ্যাসিডিটি বা গ্যাসের সমস্যা হয়। আমরা যখন ঢেঁকুর তুলি, তখনও ভেতর থেকেই হাওয়া উঠে আসে। তবে তাতে তেমন কোন সমস্যা নেই। এক আধবার টক ঢেঁকুরও উঠতে পারে। কিন্তু বারবার আপনার খাদ্যনালীতে অ্যাসিড উঠে এলে সেখানে প্রদাহ তৈরি হবে। ফলে বুক জ্বালা করবে। গলা পর্যন্ত টক টক ভাব টের পাবেন। সাধারণত অনেকক্ষণ খালি পেটে খাকলে, অতিরিক্ত চা,কফি পান করলে, মশলাযুক্ত ও ভাজাভুজি খাবার বেশি খেলে, খাওয়ার অনিয়ম হলে, রাতের খাবার খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়ার অভ্যাস থাকলে, অতিরিক্ত মদ্যপান, ধূমপান, দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা ইত্যাদি কারণে পেটে গ্যাস হতে পারে। গ্যাস, অম্বলের কারণেই পেট ফুলে ওঠে, ঢেকুর ওঠে, বুক জ্বালা করে ও পেটের অন্যান্য সমস্যা দেখা দেয়। অ্যাসিডিটি থেকে বাঁচতে এই নিয়মগুলি মেনে চলুন যাদের অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা আছে, তাদের কখনও পেট ভর্তি করে খাওয়া উচিত নয়। খাদ্যনালী যেখানে পাকস্থলীতে মেশে, সেখানে একটি রিং গোছের মাশল বা মাংস পেশি থাকে। এই মাশলটির নাম ‘ইসোফেগার স্পিংক্টার’। এই মাশল বা পেশিটি দুর্বল হয়ে গেলেই রিফ্লাক্স বেশী হয়। এর উপর পেট ভর্তি করে বা অতিরিক্ত খাওয়ার খাওয়া ঠিক নয়। এতে সমস্যাই বাড়বে। সারাদিনে অল্প অল্প করে, বার বার খেতে থাকুন। এতে শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণটাও সহজ হবে। যারা অ্যাসিডিটির সমস্যায় ভুগছেন তারা যদি ওজন কমাতে পারেন তাহলে কিন্তু অ্যাসিড রিফ্লাক্স থেকে অনেকটাই রিলিফ পেতে পারেন। তাই ওজন কমাতে শরীরচর্চা শুরু করুন এখনই। ফাস্ট ফুড, জাংক ফুড, স্ট্রিট ফুড খাওয়া বন্ধ করুন। বিশেষ করে ময়দায় তৈরি ভাজাভুজি যত কম খাবেন ততই ভালো। খুব বেশী কার্বোহাইড্রেট খাওয়া বন্ধ করতে পারলে খুব ভালো হয়। অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট হজম করতে সময় বেশী লাগে। তখন পেট ফেঁপে যায়, গ্যাস হয়। জন্ম নেয় ব্যাকটেরিয়ার। এর ফলে গ্যাস আরও বেশী হয়। কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটে সাধারণত সমস্যা হয় না। যারা খুব বেশী কফি, ফলের রস বা সফট ড্রিঙ্ক খেতে অভ্যস্ত, তাদেরও অ্যাসিডি রিফ্লাক্সের সমস্যা হয়। তাই নিয়ম মেনে খান এইসব খাওয়ার গুলি। এড়িয়ে চলুন কাঁচা পেঁয়াজ। কাঁচা পেঁয়াজ খেলে বুক জ্বালার মতো সমস্যা বেড়ে যায়। মুখে রাখতে পারেন সুগার ফ্রি চিউয়িং গাম। আপনি যত চিবোবেন তত বেশী লালা নিঃসৃত হবে মুখ থেকে। আর এতে আপনার অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণের পক্ষে দারুন সহায়ক হতে পারে। জীবনশৈলীতে পরিবর্তনঃ রাতে খাওয়ার অন্তত এক থেকে দু’ ঘণ্টা পর ঘুমোতে যান। পারলে খাওয়ার পর কিছুক্ষণ হাঁটার অভ্যাস করুন। প্রতিদিন অন্তত আধ ঘন্টা এক্সারসাইজ, যোগা করুন। প্রতি দু’ঘন্টা অন্তর কিছু খাওয়ার চেষ্টা করুন। অনেকটা সময় খালি পেটে থাকবেন না। এতে গ্যাস ও অ্যাসিডিটির সম্ভাবনা বাড়ে। সারাদিনে ৩ থেকে ৪ লিটার জল পান করতে হবে। পারলে মাঝে মাঝে ইষৎ উষ্ণ জল খেতে পারেন। বাইরের অতিরিক্ত মশলাযুক্ত কিংবা তেলে ভাজা খাবার এড়িয়ে চলুন। ধূমপান বর্জন করুন। দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে সবসময় মানসিকভাবে হালকা থাকার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে সারাদিনে নিজের জন্য কিছু সময় রাখুন এবং সেই সময়ে নিজের পছন্দের কাজ করে মন ভাল রাখুন। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ আয়ুশ মন্ত্রণালয় এবং প্রখ্যাত গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজিস্টদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে।