এই কোভিড অতিমহামারিতে বিশ্ববাসীর একটাই প্রার্থনা ছিল কোভিডের টিকা। শেষপর্যন্ত আমাদের বিজ্ঞানীরা কোভিডের ভ্যাক্সিন আবিস্কার করলো। সম্ভবত এই শতাব্দীর সেরা আবিস্কার কোভিডের টিকা আবিস্কার। কিন্তু এই টিকা আবিস্কারের ইতিহাস কিন্তু একদিনের নয়। চলুন দেখা যাক টিকা আবিস্কারের ইতিহাস। টিকা আবিস্কারের ইতিহাস টিকা আবিষ্কারের ইতিহাস বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় জীবাণুর কথা। রোগসৃষ্টির অন্যতম কারন হিসেবে বিভিন্ন জীবাণু, ভাইরাস, ব্যক্টেরিয়া ইত্যাদি। বিজ্ঞানের এই জীবাণু সম্পর্কিত শাখাকে বলা হয় ‘জীবাণুতত্ত্ব’। জীবাণুতত্ত্বের প্রকাশ ঘটেছে খুব বেশিদিন হয়নি। মনে করা হয় লুই পাস্তুরের সময়কাল থেকে মানুষ জীবাণুর মাধ্যমে প্রাণী থেকে প্রাণীতে রোগ ছড়িয়ে পড়া বা সংক্রামণের বিষয়টি বুঝতে শেখে। মধ্যযুগ থেকেই মানুষের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা ছিল যে বিষাক্ত গ্যাস বা বাষ্প থেকে সংক্রামক রোগের উৎপত্তি এবং বিস্তৃতি ঘটে। ১৮ শতক পর্যন্ত এই ধারনা মানুষের মনে এমনভাবে গেঁথে গিয়েছিল যে, কেউই এই কুসংস্কারের বাইরে গিয়ে সংক্রামক রোগগুলোকে বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে বিচার-বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেনি। ‘ম্যালেরিয়া’ রোগটির নামকরণও করা হয়েছিল এই নষ্ট বা দূষিত বায়ুর ধারণা থেকে। ইতালীয় ভাষায় ‘Mala’ অর্থ খারাপ এবং ‘Aria’ অর্থ বায়ু। অর্থাৎ ম্যালেরিয়াকে খারাপ বায়ুর প্রভাবে সৃষ্ট রোগ বলে মনে করা হতো। এখন আমরা জানি, ম্যালেরিয়া হয় প্লাজমোডিয়াম গণের অন্তর্ভূক্ত কয়েক প্রজাতির পরজীবীর দ্বারা এবং সঞ্চারিত হয় অ্যানোফেলিস মশার মাধ্যমে। ম্যালেরিয়া ছাড়াও ক্লামাইডিয়া (এক প্রকার যৌন রোগ), প্লেগ, কলেরা ইত্যাদি সংক্রামক রোগগুলো দূষিত বায়ু বা বাতাসের কারণে হয় বলে মনে করতো সাধারণ মানুষ। তৎকালীন অনেক পন্ডিত ব্যক্তি ও চিকিৎসক এই ধারণাকে অমূলক বলে দাবী করেন। ব্রিটিশ চিকিৎসক জন স্নো ছিলেন তাঁদের একজন। ১৮৫৪ সালে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টরের সোহোতে, কলেরার প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে বিষয়টি অনুসন্ধানের দায়িত্ব গিয়ে পড়ে জন স্নো-এর ওপরে। বিস্তারিত গবেষণা শেষে তিনি এর কারণ হিসেবে নগরীর একটি পানীয় জলের সরবরাহের নলকে দায়ী করেন। তিনি নগরকর্তাকে ঐ নলের উৎস বন্ধ করে দেয়ার অনুরোধ জানান। উৎসটি বন্ধ করে দেয়ার পর কলেরার প্রকোপও ধীরে ধীরে কমে আসতে থাকে। স্নো-এর এই গবেষণাটিই আধুনিক ‘মহামারী-সংক্রান্ত বিদ্যা’ বা ‘এপিডেমিওলজির’ (Epidemiology) সূচনা করেছিল বলে ধরা হয়। তাছাড়া প্রাচীন একটা কুসংস্কারকে হারিয়ে দিয়ে সংক্রামক রোগকে বিজ্ঞানভিত্তিক দৃষ্টিতে দেখার পথও খুলে দিয়েছিলেন তিনি। প্রথম টিকার আবিস্কার উল্লেখ্য যে ১৮৮৪ সালে প্রথম কলেরার টিকা আবিষ্কার হয়। এর আগে পর্যন্ত নাগরিক সচেতনতা ও সাবধানতাই ছিল একমাত্র রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। ইতিহাসের প্রথম টিকা আবিষ্কারের কৃতিত্ব দেয়া হয় ব্রিটিশ শল্য-চিকিৎসক ডা. এডওয়ার্ড জেনারকে। সতের শতকের শেষভাগে তিনি লক্ষ করেন, গো-বসন্তে আক্রান্ত গোয়ালিনীদের গুটিবসন্ত হয় না। গো-বসন্ত আর গুটিবসন্তের মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নেই। গোয়ালিনীরা যখন গাভীর দুধ দোহন করতেন তখন দুধের বাঁট থেকে ভাইরাস তাদের হাতে গিয়ে ফুসকুড়ির মতো ছোট ছোট ক্ষতের সৃষ্টি করত। তিনি চিন্তা করলেন, গোয়ালিনীরা নিশ্চয়ই তাদের শরীরে গুটিবসন্তের বিরুদ্ধে এমন এক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলেছে যা তাদেরকে এই ভয়ানক সংক্রমণ থেকে রক্ষা করছে। এখানে উল্লেখ করা জরুরী যে তীব্রতার দিক থেকে গো-বসন্ত গুটিবসন্তের থেকে কম শক্তিশালী। ১৭৯৬ সালে তিনি একজন গোয়ালিনীর হাতের ক্ষত থেকে গো-বসন্তের জীবাণু নিয়ে আট বছরের ছেলের দেহে প্রবেশ করান। গুটিবসন্তে বেঁচে যাওয়া কারও পরবর্তীতে আর এই রোগ হয় না- এমন কথা চীন ও ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল সেই সময়। এজন্য জেনার কখনই গুটিবসন্ত হয়নি, এমন একজনকে তাঁর পরীক্ষার জন্য বেছে নিয়েছিলেন। গো-বসন্তের জীবাণু ছেলেটির দেহে প্রবেশ করানোর পর ছেলেটি সামান্য অসুস্থ হয়ে পড়ে এবং দশদিনের মাথায় পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। এরও প্রায় দুই মাস পর জেনার ছেলেটির শরীরে গুটিবসন্তের শক্তিশালী জীবাণু ঢুকিয়ে দেন। তিনি বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করেন, গুটিবসন্তের জীবাণু ছেলেটিকে সংক্রমিত করতে পারেনি। ঝুকিপূর্ণ এই পরীক্ষাটির মাধ্যমে জেনার রোগ-প্রতিরোধ সম্পর্কিত তাঁর চিন্তাধারাটিকে সঠিক বলে প্রমাণ করেন। এটাই ছিল টিকার একেবারে প্রাথমিক রূপ। টিকা কিভাবে কাজ করে রোগ সৃষ্টিকারী অথচ দুর্বল একটি জীবাণু দেহে অবস্থান করলে অনুরূপ অথচ অধিক শক্তিশালী জীবাণুও সেটা দ্বারা নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কীভাবে সংঘটিত হয় সে বিষয়ে জেনার-এর কোন ধারণা ছিল না। শুধুমাত্র বাহ্যিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সংক্রামক রোগ প্রতিরোধের মূল যে প্রক্রিয়ার কথা বলে গিয়েছিলেন তা আজও টিকে আছে। পরে শুধু এর ব্যাখ্যা ও মানব দেহের রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সাথে এর সম্পর্কটা দেখানো হয়েছে মাত্র। ভ্যাকসিন শব্দের উৎপত্তি ইংরেজি ‘ভ্যাকসিন’ শব্দটিও এসেছে গাভী ও এর সাথে সম্পর্কিত বসন্ত ভাইরাস থেকে। গোয়ালিনীর হাত থেকে পৃথকীকৃত ভাইরাসের জীবাণুসমৃদ্ধ পুঁজটিকে ভ্যাকসিন বলা হয়েছিল। ভ্যাকসিন যা আসলে একটি ল্যাটিন শব্দ (vaccinus)। যদিও সেটা ছিল ইতালীয় ভাষায়। গুটি বসন্তের টিকা বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশ এবং ষাটের দশকে গুটিবসন্ত টিকার বহুল ব্যবহারের পরও খোদ ভারতীয় উপমহাদেশেই প্রতি বছর বহু মানুষ মারা যেত এই রোগে। বিশ্বে গুটিবসন্তের শেষ যে মহামারীটা হয় সেটাও এই ভারতীয় উপমহাদেশে, ১৯৭৪ সালে। এই মহামারী তখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছিল। আক্রান্ত হয়েছিল প্রায় এক লাখ দশ হাজার মানুষ এবং মারা গিয়েছিল কুড়ি হাজার মানুষ। এরপর সেখানে টিকাদানের কর্মসূচি আরও জোরদার করে প্রায় এক কোটি মানুষকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। ১৯৮০ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবী থেকে গুটিবসন্ত নির্মুলের ঘোষণা দেয়। অণুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত গুটিবসন্তই ছিল একমাত্র সংক্রামক রোগ যা টিকার মাধ্যমে প্রতিহত করা যেত। আগেই বলেছি এই প্রতিরোধের মূলমূন্ত্র ছিল অনুরূপ কিন্তু অপেক্ষাকৃত কম তীব্র বসন্তের জীবাণু। প্রাকৃতিক কারনেই গরুর শরীরে এই জীবাণুর সংক্রামণ। প্রকৃতিগতভাবেও এটা ছিল দুর্বল জীবাণু। তখনও পর্যন্ত জীবাণুকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল বা রোগাক্রান্ত না করার উপযোগী করে প্রস্তুত করার পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি। প্রথম যিনি কৃত্রিম উপায়ে একটি ব্যাকটেরিয়াকে কৃত্রিমভাবে দুর্বল করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছিলেন তিনি ফরাসী রসায়নবিদ ও অণুজীববিজ্ঞানী লুই পাস্তুর। শুধু টিকার ক্ষেত্রেই না, গুটিপোকার হাত থেকে রেশম শিল্পকে রক্ষা করে ফ্রান্সের বস্ত্রশিল্পকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন তিনি। তরল দুধ জীবাণুমুক্তকরণের পদ্ধতি “পাস্তুরাইজেশনের”ও আবিষ্কারক তিনি। তাঁকে চিকিৎসা অণুজীববিদ্যার অগ্রদূত বলা হয়। উপসংহার পৃথিবী হচ্ছে জীবাণুর আঁতুড়ঘর। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীকে এইসব জীবাণুর সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। সেজন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রস্তুতি। টিকা ছিল এই প্রস্তুতির প্রথম ধাপ। পরবর্তীতে ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী, ছত্রাক ইত্যাদির জন্য আরও বিস্তৃত পরিসরে ঔষধ আবিষ্কৃত হয়েছে, টিকাও পাওয়া গেছে। টিকা যেভাবে আমাদের আজীবন বা দীর্ঘস্থায়ী একটা সমাধান দেয়, এইসকল ঔষধ থেকে আমরা তা পাই না, কেননা এদের মাধ্যমে আমাদের ক্ষণস্থায়ী আরোগ্যলাভ হয় ঠিক কিন্তু আমরা যখন আবার সক্রিয় একটা জীবাণুর সংস্পর্শে আসি তখন পুনরায় অসুস্থ হয়ে পড়ি। টিকার আবিষ্কার মানুষকে অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যুগিয়েছে, জীবনকে করেছে দীর্ঘস্থায়ী, শিশুদেরকে দিয়েছে রোগমুক্ত নিরাপদ ভবিষ্যৎ। গুটিবসন্তকে পৃথিবী থেকে নির্মুল করা সম্ভব হয়েছে। চেষ্টা চলছে পোলিওকে নির্মুল করার। আমরা পৃথিবীর সকল জীবাণুকে পুরোপুরি জয় করতে সক্ষম হয়েছি বলা যাবে না। এদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানও থেমে নেই। লুই পাস্তুরের পর থেকে আজ পর্যন্ত আরও বেশ কিছু টিকা আবিষ্কৃত হয়েছে। এইসব টিকা তৈরির ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। লেগেছে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। কিন্তু কিছু ‘ভয়ঙ্কর’ রোগের টিকা এখনও নেই। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো সেই টিকাও আবিষ্কৃত হবে। সেই লক্ষ্যেই গত তিনশ-চারশ বছর ধরে নিরন্তর গবেষণা চলছে। লেখকঃ রাজীব দত্ত (প্রাবন্ধিক) তথ্য সুত্রঃ টিকার ইতিহাস, সমসাময়িক সংবাদপত্র।